নিজস্ব প্রতিবেদক | ইনফোবাংলা
৮ অক্টোবর ২০২৬
পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে নিজস্ব ‘সার্বভৌম এআই’ চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা বাংলাদেশের
বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর এবং বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) রেসে এক ধাপ এগিয়ে নিতে দেশের নিজস্ব ‘সার্বভৌম এআই’ (Sovereign AI) প্রকল্প চালুর আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবন সংলাপ’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এই প্রকল্পের রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
‘সার্বভৌম এআই’ (Sovereign AI) আসলে কী?
সহজ ভাষায়, যেকোনো দেশ যখন বিদেশি কোনো প্রযুক্তি, ক্লাউড বা থার্ড-পার্টি মডেলের (যেমন ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি বা গুগলের জেমিনি) ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে—নিজের দেশের নিজস্ব ডেটা, জনবল, অবকাঠামো এবং কম্পিউটিং শক্তির মাধ্যমে নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ও পরিচালনা করে, তাকেই ‘সার্বভৌম এআই’ বলা হয়। এর মাধ্যমে দেশের গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ও বাস্তবায়নের রূপরেখা
- বাস্তবায়নের সময়সীমা: আগামী ১২ মাস বা ১ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও চালু করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
- হার্ডওয়্যার ও চিপ নিশ্চিতকরণ: এই বিশাল ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হাই-স্পিড কম্পিউটিং চিপ (High-speed Computing Chips) এবং মেমোরি ব্লক ইতোমধ্যে নিশ্চিত বা সোর্সিং করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপদেষ্টা।
- বৈশ্বিক প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব: এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি বড় দেশের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত বা পরিপক্ব (Mature Stage) পর্যায়ে রয়েছে।
- কারা সুবিধা পাবেন: এই সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালু হওয়ার পর এটি শুধু সরকার বা নির্দিষ্ট কোনো মহলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের বেসরকারি খাত (Private Sector), স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
- বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM): এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলায় একটি শক্তিশালী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) তৈরি করা। এর মাধ্যমে দেশের সরকারি ও বেসরকারি সেবা এবং তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
- পরিবেশগত ও শক্তি পরিকল্পনা: এআই ডাটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ এবং কুলিং ব্যবস্থার জন্য পানির প্রয়োজন হয়। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ডাটা সেন্টারগুলো যেন সম্পূর্ণ জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর না করে, সেজন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং একাধিক বিকল্প শক্তির উৎস রাখার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে ডাটা সেন্টারের চূড়ান্ত ভৌগোলিক স্থান এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
প্রকল্পটির লক্ষ্য ও দূরদর্শী গুরুত্ব
- ক্রেতা থেকে সরবরাহকারী হওয়া: বাংলাদেশ আর কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা বা ক্রেতা হয়ে থাকতে চায় না, বরং অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির নিট সরবরাহকারী হিসেবে বিশ্ববাজারে আত্মপ্রকাশ করতে চায়।
- ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। আর এই অর্জনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অর্থনৈতিক ইঞ্জিনের প্রধান অক্ষ হিসেবে কাজ করবে।
- প্রশাসনিক সংস্কার ও গতিশীলতা: সরকারি নথিপত্র এবং ড্রাফট রিভিউয়ের মতো কাজগুলোতে বাংলা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মঘণ্টা বাঁচানো এবং নাগরিক সেবাকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক এআই মানচিত্রে দেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
Comments
Post a Comment